গল্প সুকেশিনী
লেখক: আকাশ হোসেন রবিন (AHR)
আট বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখলো আকাশ। বিদেশে পড়াশোনা শেষে চাকরি করছিল, কিন্তু হঠাৎ একদিন তার মা ফোন করে বলেছিলেন,
“বাবা, আর কতো দূরে থাকবে? এই বার ফিরে আয়… তোকে ছুঁয়ে দেখতে মন চায়…”
মায়ের কণ্ঠে সে বিষণ্ণতা ছিল, যা আকাশের বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। সে আর দেরি করেনি, সব ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিল।
গ্রামে পৌঁছে মা তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
“তোকে না ছুঁয়ে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস!” – বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন আকাশের মা, পারুল বেগম।
দিন যেতে লাগলো। মা ছেলের পুরনো বাড়িতে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এলো। কিছুদিন পরেই মা বিয়ের প্রসঙ্গ তুললেন।
“তোর তো বয়স হয়ে গেল রে, বিয়ে করবি না?”
আকাশ লাজুক হেসে বললো,
“আপনি পছন্দ করলেই বিয়ে করে ফেলি।”
এক সপ্তাহ পর রায়হানের মা তার জন্য মেয়ে দেখতে গেলেন। মেয়েটির নাম সুকেসিনী রূপ যেন অপ্সরীর মতো। লম্বা ঘন চুল, বড় বড় চোখ, আর একরকম অদ্ভুত সুন্দর হাসি। সবাই বলল,
“এ রকম মেয়ে কপালে থাকে না…”
তিন মাস পর বিয়ে হয়ে গেল সুকেসিনীর সাথে। প্রথমদিকে সব কিছু স্বপ্নের মতো লাগছিল আকাশের। কিন্তু বিয়ের এক মাস যেতে না যেতেই শুরু হলো অদ্ভুত ঘটনা।
আকাশ হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলো। শরীর শুকিয়ে যেতে লাগলো। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখের নিচে কালো দাগ। চিকিৎসক বললেন,
“এটা যেন রক্তশূন্যতা… কিন্তু পরীক্ষায় কিছুই ধরা পড়ছে না।”
গ্রামেও শুরু হলো এক মৃত্যু মহামারী, গ্রামে একের পর এক খুন হতে লাগলো। প্রত্যেকটি খুন রাতে হতো- এবং সকালে লাশ পাওয়া যেত রক্তহীন অবস্থায়। মুখগুলো থাকতো আতঙ্কিত, চোখ ফাঁকা, গায়ে এক ফোঁটা রক্তও না।
গ্রামবাসীরা কানাঘুষা করতে লাগলো।
“এটা তো ডাইনি রে… রক্তচোষা ডাইনি…”
আকাশ এসব বিশ্বাস করতো না। কিন্তু এক রাতে ঘুমের ঘোরে সে দেখল সুকেসিনী তার বুকের ওপর বসে আছে। লম্বা এলোমেলো চুল গুলো বাতাসে উড়ছে, চোখ লাল রক্তের মতো জ্বলছে, দাঁত দিয়ে সে রায়হানের গলার দিক কামড় বসালো।
“তোমার রক্ত অনেক মিষ্টি আকাশ, আমি তোমাকে একবারে শেষ করব না আমি তোমাকে সারাজীবন আমার করে রাখবো…” – ফিসফিস করে বলল সুকেসিনী।
লাফ দিয়ে উঠে বসলো আকাশ, চোখ মেলে দেখল, কিছুই নেই। ঘর খালি। কিন্তু গলার পাশে জ্বলুনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল – দুই পাশে ছোট ছোট দাঁতের দাগ। আকাশ সংকোচে পড়ে গেলো সেটা কি স্বপ্ন ছিল যদি স্বপ্ন হয় তাহলে এই দাগ???
ভাবতে ভাবতে বিছানায় তাকিয়ে দেখে সুকেসিনী তো ঘুমিয়ে আছে।
এভাবে আকাশের জন্য রাতগুলো হয়ে উঠল আতঙ্কের।
রোজ রাত তার সাথে কিছু না কিছু হচ্ছে, হয় সে স্বপ্নে দেখছে কেও তার রক্ত শুষে নিচ্ছে, আবার কখনো মনে হচ্ছে তার বুকে ধারালো নখ বিশিষ্ট হাত দিয়ে কেও হাত বুলাচ্ছে বা কেও তার বুকের উপর বসে তাকে এক দৃষ্টিতে দেখছে।
একদিন আকাশ না ঘুমিয়ে শুধু শুয়ে ছিল চোখ বন্ধ করে, হঠাৎ সে খাট নরার অনুভূতিতে চোখ খুলে দেখলো সুকেসিনী কোথায় যেনো যাচ্ছে। তার সন্দেহ হলো তাই সে পিছু নিল।
দেখলো ও মাঠের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে আকাশও ওর পিছু পিছু যাচ্ছে। হঠাৎ আকাশের চোখ গেলো সুকেসিনীর পায়ের দিকে, একি ওর পা উল্টো কেনো। ভয়ে ঘামতে লাগলো আকাশ।
ওই সময় মাঠের রাস্তা দিয়ে এক জেলে মাছ ধরে ফিরছিল, সেই মুহূর্তে জেলেটি সুকেসিনির সামনে এসে বলে মা তুমি এত রাতে এখন কি করছো?
এই বলতেই সুকেসিনীর চুল লম্বা হয়ে লোকটিকে পেঁচিয়ে ধরে, আর সুকেসিনী তার হাত দিয়ে লোকের মুখ চেপে ধরে গলায় কামড় বসায়। রক্ত শুষে নিচ্ছে। কয়েক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পরে আর এসব আকাশ একটি গাছের আড়ালে দাড়িয়ে দেখছে।
আকাশ বুঝতে পারলো, যে মেয়েকে সে বিয়ে করেছে, সে মানুষ নয়। তার স্ত্রী এক ডাইনি।
আকাশ তার মাকে বলল সব। মা অবাক হয়ে বললেন,
“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারি নাই, রে। মেয়েটা দিনে এমন শান্ত, আর রাতে যদি…!”
তারপর তারা একজন গায়েবি তাবিজওয়ালার কাছে গেলেন। সেই বুড়ো মানুষটি বললেন,
“তোমরা ডাইনি ঘরে এনেছো। ও দিনের আলোয় মানুষ, রাতে রক্ত চুষে খায়।
তাবিজওয়ালাটি বলল একমাত্র উপায়- সুকেসিনীর চুল কেটে ফেলতে হবে। কারণ চুলেই তার শক্তি।
এক রাতে আকাশ তৈরি হলো। বালিশের নিচে এক ধারালো ছুরি নিয়ে রাখলো। সে অপেক্ষা করতে লাগলো। গভীর রাতের সময় তখন, সুকেসিনী বদলে যেতে লাগলো। তার চোখ লাল, নখ বড় হয়ে গেল, দাঁত বেরিয়ে পড়লো, পা গেলো উল্টে আর চুল খুলে উড়তে লাগলো।
সে ধীরে ধীরে আকাশের বুকে উঠে তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো, তারপর ধীরে ধীরে আকাশের গলার কাছে গিয়ে কামড় বসালো,- ঠিক তখনই আকাশ চোখ খুললো এবং সাবধনে বা বালিশের নিচ থেকে ছুরিটি বের করলো, এবং ঘুমের মধ্যে সুকেসিনীকে জড়িয়ে ধরার ভান করে তার লম্বা চুলের গোড়া ধরে কেটে ফেললো। চিৎকার করে উঠলো সুকেসিনী –
“না!!! আমার শক্তি…!!”
সেই চিৎকারে পুরো ঘর কেঁপে উঠলো। বাতাসে যেন আগুনের গন্ধ। তারপর তার শরীরটা ধীরে ধীরে ছাই হয়ে মাটিতে মিশে গেল।
তারপর থেকে আর কোনো খুন হয়নি গ্রামে। আকাশ আবার সুস্থ হতে লাগলো।
কিন্তু এসব এখানেই শেষ নয়।
একদিন বাড়ির বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল আকাশ। পাশের ছায়ায় একটা চেনা কণ্ঠ শুনল –
“তুমি ভেবেছিলে আমি মরে গেছি? রক্তচোষারা কখনো মরে না, আকাশ…”
চমকে উঠল সে। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।
কেবল বাতাসে ভেসে এলো এক ফিসফিসানি…
“সুকেসিনী ফিরে আসবে… ফিরে আসবেই…”
