গল্পঃ শেষ বিদায় স্টোর
লেখকঃ মির্জা শাহারিয়া
ঘড়িতে ১১ টা বেজে ৩১ মিনিট। গ্রাম-মফস্বলের জন্য প্রায় মাঝরাত বলা যায়। তবে তা হেলাল উদ্দিনের জন্য রাতের প্রথম প্রহরও নয়। গভীর থেকে গভীরতর রাত তার কাছে কেবল শুধু সাধারণ এবং স্বাভাবিক। বছর দশেক আগে দেওয়া এই দোকানটাই তার একমাত্র এবং নির্দিষ্ট সম্বল। সারাদিনটা মামুন দেখেশুনে রাখলেও, রাতে ছোকড়াটাকে এ দোকানে এ দন্ড বসিয়ে দেওয়াও যেন অসম্ভব! তার এক কথা, কাফনের কাপড়ে বন্দি কফিন, রাতের দিকটায় সে সামলাতে পারবেনা। এমনিতেই তার নাকি এসবে বিরাট ভয়।
অগত্যা তাই হেলাল উদ্দিন নিজেই রাতের এই সময়খন্ডে দোকানে থাকেন। ১২ টা বাজলেই দোকান বন্ধ হয়। দোকানের পিছনের পার্টিসনে একটা চৌকি পাতা থাকে সবসময়। রাতটায় সেখানেই ঘুমান হেলাল উদ্দিন। দোকানে যে মালসামান আছে, তার দাম মোটেও কম নয়। তাছাড়া অনেক সময় এদিকটায় চোর ছেচাড় দেরও আনাগোনা বাড়ে। তাই স্ত্রী সন্তানহীন সংসারের একলা কর্তা হিসেবে রাতটা টার এখানেই কেটে যায়। অন্তত গত বছর সাতেক থেকে তেমনটাই হয়ে আসছে।
হেলাল উদ্দিন তার একমাত্র পিতাকে মৃত্যুর কাফনের কাপড়ে জড়াতে পারেননি, একমাত্র টাকা আর সাড়ে তিনহাত সেই কাপড়ের সংকটে। যদিমা শেষবেলায় শহর থেকে কাপড়খানা চেয়ারম্যান সাহেব নিজে আনার তদবির করতো, তবে হয়তো দাফনটাও তাকে এই বিশেষ কাপড় ব্যাতীতই করাতে হতো। গ্রামের গরীব মানুষদের জন্য মৃত্যু নামক বিয়োজন যেন আরেক আতঙ্কে নাম ছিলো সেসময়।
তার বাবার সাথে ঘটতে যাওয়া ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য এই ভিন্নধর্মী ব্যবসায় তার আগমন। প্রত্যেক প্রিয়জনকেই তো একসময় তাদের বিদায় জানাতে হয়। শেষ বিদায়ের বেলায় যেহেতু তার প্রয়োজন পড়ে, তাই সে দোকানের নাম রেখেছে শেষ বিদায় স্টোর। মানুষের হায়াত ফুরালেই যে স্টোরে একমাত্র পাওয়া যায় ক্রেতার ছোঁয়া!
হাতঘড়ি উঠিয়ে সময়টা আরেকবার দেখে নিলেন হেলাল উদ্দিন। বড় কাঁটাটা ৯য়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ ১১ টা ৪৫। মেঘ গুরুমের আওয়াজ আসলো কানে। আজকের আকাশটা মোটেও ভালো না। এই বুঝি বৃষ্টি নামলো বলে! মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া যেন সে কথারই জানান দিচ্ছে।
কাঁচা রাস্তার ধারে থাকা এই শেষ বিদায় স্টোরের পাশটায় একটা ছোট্ট চায়ের দোকান আছে রমিজ মিঞার। হেলাল উদ্দিন উঁকি মারলেন। না, সেটাও বন্ধ। আজ একটু জলদিই বোধহয় লোকটা টলপি-টলপা গুটিয়ে পালিয়েছে।নাহয় একটু গরম গরম চা খাওয়া যেত, সাথে একহাড়ি গল্প। কপাল খারাপ, কিছুই মিললো না।
ভাবছেন দোকানটা বন্ধ করে শুয়েই পড়বেন কিনা। দু এক ফোঁটা বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। আশপাশে দূরদূরান্ত অব্দি কোনো ঘর নেই। মাইল দুয়েক দূরের যেই বাড়ি গুলো থেকে মিটিমিটি আলো আসতো, সেগুলোও বন্ধ। বোধহয় কারেন্ট চলে গিয়েছে। অবশ্য কারেন্ট যাওয়া-আসা কখন করে, তা হেলাল উদ্দিন জানেন না। এই দোকানটায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। দিনে গরমে হাত পাখা, আর রাতে অন্ধকারে তেলের কুপি দিয়েই কাজ চলে যায়। যে দোকানে অঘটন ছাড়া কোনো ক্রেতা আসেনা, তার জন্য এই ব্যবস্থাই যুতসই!
না! এ আবহাওয়ায় এভাবে বসে থেকে কোনো লাভ নেই। আসন থেকে নেমে দাঁড়ালেন তিনি। চোখ গুলো ঢলে ঢলে আসছে। ঠান্ডা বাতাস যেন ঘুমের ওষুধের বড়ি হিসেবে কাজ করছে। বিছানার নরম উষ্ণতা তাকে ডাকছে। এ ডাকে সায় দেওয়া ছাড়া যে আর উপায় নেই!
টিনের দুটো সাটার নামিয়ে দিলেন দুপাশ দিয়েই। হাতে তেলের কুপিটা নিয়ে পা বাড়ালেন মাঝের পার্টিসনের দিকে। দেয়ালে সাড়িবদ্ধভাবে হেলিয়ে রাখা কফিন গুলো যেন মহাপ্ৰাচীরের ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিলো দোকানটার বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে। বাকি যে অংশটুকুতে আলমারির অবস্থান, তাতে রয়েছে কাফনের কাপড়ের একচ্ছত্র আধিপত্য। সাথে আছে জানাজা-দাফনের সময় প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের সমাহার।
পার্টিসনের দরজাটা খুলে নিজ দোকানের ছোট্ট শয়নকক্ষে প্রবেশ করলেন হেলাল উদ্দিন। বিকট শব্দে আকাশ গর্জে উঠলো। কানে ভেসে আসলো বৃষ্টির ঝুমঝুম আওয়াজ। আকাশটা বোধহয় আজ সারা রাতই এমন করবে।
বিছানায় বসে কুপির আলোটা এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিলেন। গা এলিয়ে দিলেন নরম উষ্ণ গদিতে। আহ! সে কি আরাম! যেন এক টুকরো দুনিয়ার জান্নাত। মনে মনে আয়াতুল কুরসি সহ যাবতীয় দোয়া পাঠ করতে করতে কখন যে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন, বোঝা গেলো না। ক্ষণিক সময় পর শুধু তার মৃদু নাক ডাকার আওয়াজ নিশ্চিত করলো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছে প্রাণটা!
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলেন, বোধোদয় হয়নি। খট করে হওয়া এক আওয়াজ, তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালো। চোখ মেলে অন্ধকারে সামনে তাকিয়ে ছিলেন কয়েক সেকেন্ড। বোঝার চেষ্টা করছিলেন, আওয়াজটা কীসের। খট খট আওয়াজটা একটু পর পরই হচ্ছে। থেমে থেমে। সময় নিয়ে।
আচ্ছা, কোনো কফিন কী অন্য কফিনের সাথে ধাক্কা খেয়ে এমন শব্দ তুলছে? কিন্তু এতো ভারী জিনিস গুলো এভাবে নড়ছে কেনো? নিশ্চয়ই দমকা হাওয়া তার বন্ধ দোকানে চোরের
মতো ঢুকে পড়েনি?
“মাস্টার! ঘুমাইছোনি!”
চাপা একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সাথে এলো কিছু খটখট আওয়াজ।
“কে!!!”

“আমি মাস্টার। আমি।”
হেলাল উদ্দিন শোয়া হতে উঠে বসলেন। একসময় মাধ্যমিক স্কুলটাতে পড়িয়েছিলেন। সেই থেকেই গ্রামের বেশিরভাগ লোক তাকে মাস্টার নামেই ডাকে। এ পরিচয় তাকে একদমই বিরক্তি দেয় না। তবে, সময়টা তাকে হতাশ করলো। হাতঘড়ির রেডিয়াম কাঁটা বলছে রাত ১ টা পার হয়েছে। এতো রাতে, এতো সুন্দর একটা ঘুম! ইশশ, লোকটা বড্ড অসময়ে তার কাছে এসেছে।
“মাস্টার, আমি পাশের গ্রাম থেইকা আইছি। আমার একটা লোক মারা গেছে, তুমি যদি আমারে কিছুটা কাপড় দিতা!”
তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও গরম বিছানাটা তাকে ছাড়তে হলো। “যাচ্ছি। একটু দাঁড়ান।”
চপ্পল দুটো পায়ে চাপিয়ে মাতাল পায়ে এগিয়ে গেলেন পার্টিসনের দরজায় কাছে। রাত বিরাতে দোকান পাহারা দিতে গিয়ে, খদ্দেরের দেখা মিলাটাও তার কাছে নতুন নয়। বেশ অনেকবার এমনটা তার সাথে হয়েছে। পাশের গ্রাম গুলোতে কেউ মারা গেলে তাদের লোকেরা মাঝরাতেই এসে দাফনের সরঞ্জামাদি নিয়ে যায়, সকাল হতেই জানাজা পড়ে দাফন দিবে বলে। দৃশ্যপট তার কাছে নতুন নয়। কিন্তু শব্দটা এই প্রথমবার শুনেছে। শাটার গুলো টিনের তৈরি, তারপরও তাদের থেকে খট খট শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে কীভাবে!
কুপি হাতে নিয়ে শাটারের কাছাকাছি আসলেন। আধখোলা চোখে কুপির আলোয় সঠিক চাবি বাছাই করে খুলতে লাগলেন তালা।
“কষ্ট নিওনা মাস্টার। খুব বিপদে পইড়া আইছি। তার উপর আসমানডাও কী যে লাগাইলো, আইতেও তাই দেরি হইয়া গেলো।”
তালা খুলে পাশে রেখে একপাশের শাটার তুলে দিলেন হেলাল উদ্দিন।
“কই আপনি?” অন্ধকারে অজানা ব্যক্তিটিকে খুঁজতে লাগলেন হেলাল। “বলেন, কী
লাগবে?”
“আমি সাইডেই আছি। তুমি আমারে একটা কফিন, একটা কাফনের কাপড়, আর একটা খাটিয়া দাও।”
“খাটিয়া? খাটিয়া তো আমার কাছে নাই। এটা তো স্থানীয় মসজিদে থাকার কথা।” হাই তুললেন হেলাল। “তাদের সাথে, যোগাযোগ করেননি?”
“করছিই তো। ওরা কয়, খাটিয়া দিবো না। তোমার ধারে তো সব কিছুই আছে। খাটিয়াডাও তো থাকার কথা।”
“আমি ওটা বেচিনা। ওটা কিনতে হলে, আমার কাছে আগে অর্ডার দিতে হয়।”
“আগে জানতাম না। অবশ্য জানলেও কাম হইতো না। মরণ কী আর অগ্রীম টিকিট নিয়া আসে কও?”
“তা তো আসেনা। বলেন, কী কী নিবেন তাইলে।” ছোট করে ফের হাই তুললেন হেলাল উদ্দিন। “আমার ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসতেছে।”
“তাইলে কফিন, আর কাফনের কাপড় টাই দাও।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
হেলাল উদ্দিন শাটারের পাশ থেকে ভিতরের দিকে অগ্রসর হতে নিলেন। পর মুহুর্তেই থেমে অজানা লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কফিন যে নিয়ে যাবেন, গাড়ি কোথায়?”
“গাড়ি লাগবো?”
“এতো ভারী কফিন একলা উঠাবেন কীভাবে?”
“তাও তো সঠিক। এতো রাইতে, এহন আমি গাড়ি পামু কই!”
“এক কাজ করেন, কাফনের কাপড় টাই নিয়ে যান। লাশ কাফন পড়ায় খাটিয়ায় তুলে দিবেন। সমস্যা হবে না। দাফনের ক্ষেত্রে কফিন ম্যান্ডেটরি না।”
“কাফন দিয়েই কাজ চলবো?”
“হ্যা। তাও বেশ নিশ্চিত্তে।”
“দাও, আমারে মোটা দেইখা তাইলে একখান কাফনের কাপড় দাও।”
আলমারির দরজা টেনে খুললেন হেলাল উদ্দিন।
“কাফনের কাপড় আবার মোটা চিকন হয় নাকি! সব কাপড়ই এক। মোটাও না, চিকনও না।”
পলি ব্যাগে মোড়ানো একটা ভাজ করা কাপড় উঠিয়ে শাটারের দিকে এগিয়ে আসলেন হেলাল উদ্দিন। অন্ধকারে নজর ঘুরিয়ে বললেন, “কই আপনি! এইযে নেন। এটার দাম ২৫০ টাকা। এতো রাতে কষ্ট করে আসছেন, আপনি ২০০ই দিয়েন।”
অন্ধকার থেকে দুটো হাত এগিয়ে এসে কাপড়ের প্যাকেটটা গ্রহণ করলো।
“আরে! এতো দেহি অনেক পাতলা! এ দিয়ে তো আমার ঠান্ডা কিছুতেই যাইবো না!”
অবাক হলেন হেলাল উদ্দিন। “মানে?”
“মানে, এই ঝড়বৃষ্টির রাইতে, এতো পাতলা কাপড়, মাটি তো মেলা ঠান্ডা করবো!”
ছোট্ট শ্বাস ছাড়ার শব্দ এলো হেলালের কাছ থেকে। “আমি মোটেও মজার মেজাজে নেই। নিলে নেন। নতুবা আমাকে একা ছেড়ে দেন। আমি ঘুমাবো।”
“আচ্ছা, তাইলে তুমি আমারে আরেকটা কাফনের প্যাকেট দাও। দুইডা একসাথে করলে, যদি কিছু কাম হয়!”
“আজব মানুষ আপনি! প্রথমে বললেই হতো!” অন্ধকারে লোকটার অবয়বে চোখ বোলালেন। “সাথে আর কিছু লাগবে কী? পরে আবার বলিয়েন না এটা-ওটা প্রয়োজন।”
“লাশের গন্ধ তারায় কেমনে? তোমার ধারে কিছু আছে নি এমন?”
“গোলাপ-পানি আছে।”
“তাইলে এক বোতল দিয়ো।”
হেলাল উদ্দিন আবার চলে গেলেন কাঠের আলমারির দিকে। দুয়ার দুটো খুলে প্রয়োজনীয়
জিনিস নিয়ে দ্রুত ফিরে আসলেন দোকানের সামনে।
“এই নেন। সর্বমোট চারশত পঞ্চাশ টাকা।”
“আচ্ছা, টাকাডা তোমারে কাইল সকালে দিলে হয় না! আসলে আমি বড় বিপদে পইড়া তোমার দ্বারস্থ হইছি। এহন তুমি যদি….”
চুপচাপ কিছু একটা ভেবে গেলেন হেলাল উদ্দিন। হয়তো গ্রামের গরীব কিংবা অসহায় কোনো পরিবার হবে। ব্যবসায়িক নিয়তের পাশাপাশি সদকা হিসেবে অনেক সময় সে সাহায্য স্বরূপ অনেক কাপড়ই দান করেছে। আজকেও যে তা করা অসম্ভব নয়, তা না। তবে লোকটার কথা কেমন যেন এলোমেলো। হয়তো তাদের দুজন মারা গিয়েছে। তাই দুটো কাপড় নিয়েছে। না, এ নিয়ে একটু বেশিই চিন্তাভাবনা করছে সে। পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে, লোকটা হয়তো বিপর্যস্ত। তাই কথায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।
“রেখে দিন। টাকা দিতে হবেনা।”
“তোমারে ধন্যবাদ মাস্টার। তোমার মতো ভালো মানুষ আছে বইলাই, দুনিয়াডা এহনো ধ্বংস হয়নাই।” কিছুটা হেয়ালি যেন ফুটে উঠলো আগন্তুকের কথায়। “অথচ কত মানুষই তো রূপ বদলাইলো। ক্ষণে ক্ষণে। কত রাইতের আড়ালে যে চাপা পইড়া যায় সেই কুকর্ম। আল্লাহ মালুম!”
“ঠিক বুঝলাম না!”
“যাই মাস্টার। আমার হাতে সময় নাই। তুমি ভিতরে যাও, সাবধানে থাইকো। এতো রাইতে তোমার ঘুমে পীড়া দেওয়ার লাইগা, রাগ কইরো না। মার্জনা কইরা দিয়ো।” ক্রমেই আওয়াজটা যেন কমে এলো আগন্তুকের কাছ থেকে। যেন সে হেঁটে হেঁটে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। “কিইবা করতাম কও, এরা জানাজা পড়াইবো না। দাফন ছাড়াই মাটিচাপা দিবো। যদি এই কাপড় দুইডা আমার কবরের সম্বল হয়, তাতেই মেলা। যাই মাস্টার, ভালো থাইকো।”
ঘুম ঘুম চোখে দোকানের শাটার নামাচ্ছিলেন হেলাল উদ্দিন। তবে ঘুম যেন বারুদের মতো উড়ে গেলো শেষ কথা গুলো শুনে।
“আমার কবর!!!”
হুড়মুড়িয়ে শাটার তুলে কুপি হাতে বেড়িয়ে এলেন হেলাল। আশপাশ হন্য হয়ে খুঁজতে
লাগলেন কাউকে। বৃষ্টির ছোট দুয়েক ফোঁটা পড়লো তার গায়ে। নির্বিঘ্ন এই অন্ধকারে যতদূর চোখ যায়, রাস্তার দু ধারে কেউ নেই! কিচ্ছু নেই!
ভয়ে গা শিউরে উঠলো তার! এতোক্ষণ যার কাছে সে কাপড় হস্তান্তর করলো, তার অস্তিত্ব এতো দ্রুত মিলিয়ে গেলো কোন জগতে! এ কেমন প্রহেলিকা!
দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে দোকানের ভিতরের দিকটায় এলেন সময় করে। ভয়ে ভয়ে শাটার নামাতে যাবেন, অমনি তার চোখে পড়লো একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো। টুকরোটা তার বসার আসনের সামনেই পড়ে আছে।
শাটার নামিয়ে দিলেন। তালা ঝুলিয়ে নিচ থেকে তুলে নিলেন সেই ছোট্ট কাগজটা।
“দক্ষিণ পাড়ার লিচু বাগানটায় ওরা আমারে খুন করছে। তুমি আমার লাশটা উঠানোর ব্যবস্থা কইরো মাস্টার। ওরা অনেক খারাপ। পুলিশ ছাড়া আগাইয়ো না। ময়না আর ময়নার মারে সময় পাইলে একটু দেখতে যাইয়ো। অসময়ে তোমারে পীড়া দেওয়ার লাইগা, আমারে মার্জনা কইরো।”
হেলাল উদ্দিন বুঝতে পারছেন তার কপালে এই ঠান্ডায় মুহুর্মুহু ঘাম ঝড়ছে। ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, এতোক্ষণ খদ্দের ভেবে সে কার সাথে কথা বলছিলো! ভয়ানক এক সময়ের সম্মুখীন সে। না, আর পারছেনা। তার প্রেসার হাই হয়ে যাচ্ছে। তাকে বিশ্রামস্থলে যেতে হবে। এই রাত তার জন্য ভীষণ অচেনা। ঘুম যেন এখন তার কাছে এক টুকরো সোনার হরিণ!
“আরে রমিজ মিয়া! যাও কই!”
গ্রামের মেঠোপথ ধরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়া রমিজকে থামিয়ে দিলেন মনজুর তালুকদার।
“লিচু বাগানে। যাইবা নাকি?”
“এতো সাত সকালে লিচু খাওনের শখ নাই।”
“শুনলাম ঐহানে নাকি পুলিশ আইছে? বিরাট ঝামেলা!”
“শদুর মিয়ার লিচু বাগানে… পুলিশি ঝামেলা? ব্যাপারটা কী?”
“আমিও তো জানিনা। লও আমার লগে, যাইয়া দেখি বিষয়টা কী।”
“চলো। আমার তো টেনশন বাড়তাছে। শদুর মিয়ার বাড়িতে আমার ভাগ্নির বিয়ার কথা চলতাছে। এমনসময় এইসব তো ভালো লক্ষণ না!”
রমিজ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মনজুর তালুকদার যেন হনহন করে ছুটে যেতে লাগলেন মেঠোপথের বিপরীতে। মেঘ ভেদ করে আকাশে দৃশ্যমান হলো সম্পূর্ণ সূর্য!
“দেখেন হেলাল সাহেব, যদি আপনার অভিযোগ সত্যি না হয়, তবে কিন্তু আমাদেরকে এভাবে হেয় করার জন্য, আমরা আপনার উপর একশন নিবো।” (পুলিশ অফিসার)
“আপনি আমার কথা বিশ্বাস করুন স্যার। এইযে, এইযে এইখানে কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে। দেখেন, এটার মাটি কেমন নরম। আশপাশের মাটি ভরাট, কিন্তু এখানকারটা একদম হালকা।” (হেলাল উদ্দিন)
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন বাগান মালিক শদুর মল্লিক। রীতিমত রেগেমেগে তিলি বললেন, “মগের মুল্লুক নাকি! সাধারণ এক দোকানানির কথায়, আমার বাগানে খোঁড়াখুঁড়ি আমি একদম হইতে দিমু না।”
“দেখুন অফিসার। আমি আপনার কাছে অভিযোগ করেছি। আপনার সাহায্য চেয়েছি। অন্ততপক্ষে সেটা আমায় করুন। যদি কিছু না মিলে, তবে। তবে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিবো। আমার কোনো আপত্তি নেই তাতে।” অধৈর্য হয়ে বললেন হেলাল উদ্দিন।
“আমার আপত্তি আছে। তুমি এক্ষনি আমার বাগান থেইকা বাইর হইয়া যাও।” তেড়ে আসলেন শদুর মল্লিক।
“থামুন।” হাত উঁচিয়ে বাগান মালিকের আওয়াজ বন্ধ করলেন থানার ওসি। হেলাল উদ্দিনের দিকে ফিরে শক্ত কণ্ঠে বললেন, “আপনার কথা যদি মিথ্যে হয়, তবে খুব খারাপ পরিণতি আপনাকে বরণ করতে হবে। কনস্টেবল, মাটি খোড়ার ব্যবস্থা করো।”
“কিন্তু ওসিসাব!” চিন্তিত শোনালো শদুর মল্লিকের কণ্ঠটা।
“আমি আর কোনো কথা শুনতে ইচ্ছুক নই! কনস্টেবল, দ্রুত হাত চালাও।” (পুলিশ)
সময় যেতে লাগলো। প্রতিটি প্রহরেই যেন নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছিল বাগান মালিকের।
তিনি আস্তে আস্তে পিছপা হতে লাগলেন। সব শেষ, এবার তার রক্ষে নেই। এতো গোপনে কাজটা করার পরও, এই ছোট্ট দোকানদার তা কীভাবে জানালো!
আস্তে আস্তে মাটি খুঁড়তেই বেড়িয়ে আসতে লাগলো এক মধ্যবয়সী মানুষের লাশ। আশ্চর্য দৃষ্টিতে দোকানদার হেলাল শুধু দেখে গেলো লাশের গায়ে জড়িয়ে থাকা কাফনের কাপড়টা। একটা নয়, দু দুটো কাফনের কাপড় একসাথে পেঁচানো! নাকে বাজে নয়, মিষ্টি গোলাপের সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। তার মানে কী….!
না, কোনো কিছুই মিথ্যে নয়। তাহলে কাল রাতে এই লোকটাই তার কাছে এসেছিলো, নিজ লাশকে পেঁচানোর জন্য কাফনের দুটো কাপড় নিতে!
চোখ বুজে ফেললো হেলাল। লাশ উঠিয়ে আনতেই শোরগোল পড়ে গেলো চারপাশে। কানে আসলো কিছু কথার আওয়াজ। কেউ যেন পালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ তাকে ধাওয়া দিতে পিছু নিলো সজোরে।
হ্যা, হয়তো এইসব কিছুর পিছনের মূলহোতা পালানোর মহাব্যর্থ চেষ্টা করছে। তবে সে কী জানেনা? তার জন্য এটা মোটেও সহজ হবে না? তার বিরুদ্ধে যে লাশটা নিজে থেকেই সাক্ষ্য দিয়েছে!
বৃষ্টি মুখর রাত নয়। তবে শান্ত এবং হীমময় সেই রাতের প্রকৃতি। ঝিঁঝিঁ পোকারা অনবরত ডেকে চলেছে পাশের ঝোপঝাড় থেকে। আকাশে আজ উঠেছে গোলাকার স্বচ্ছ এক চাঁদ। চাঁদের সেই আলো, গ্রামকে গ্রাম, করে তুলেছে দৃশ্যমান।
কেউ একজন হেঁটে আসছে, খালি পায়ে! আশ্চর্য? পায়ের মাটি গুলো কী একটু ঝেড়ে নিবে না সে? এভাবে ভেজা মাটিতে ডুবে থাকা পা নিয়ে কেউ কী এভাবে হাঁটে! একদমই বেমানান! এই ভুল মোটেও অনুকরণীয় নয়।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হেলাল। হঠাৎ খট খট শব্দের তোড়ে ঘুম ভেঙে গেল তার। চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে। খট খট শব্দটা কিছুক্ষণ পর পর হচ্ছে। সময় নিয়ে।
কফিনে কফিন লেগে কী এই শব্দটা হচ্ছে? কিন্তু এতো ভারী কফিনকে এভাবে নাড়াবে কে!
“মাস্টার! ঘুমাইছোনি!”
অচেনা এক চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। হেলালের ঘুম যেন উড়ে গেলো বারুদের মতো। ফিরে এসেছে, গভীর রাতের এক খদ্দের!
“আমার কয়ডা কাফনের কাপড় লাগতো, যদি তুমি দিতা!”
খোলা থাকা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললেন। শেষ বিদায় স্টোরে এখন কী অন্য জগতের খদ্দের আসা শুরু করলো তবে! হায়!!! এটা অসম্ভব!
না, তাকে উঠতেই হবে। এ নিয়ে ছাপ্পান্ন বার। প্রতিবারই জিনিস না নিয়ে তারা ফিরেনি। না জানি এ সংখ্যাটা কততে গিয়ে শেষ হবে।
“আমার ধারেও কিন্তু টাকা নাই, টাকা চাইয়া আমারে আবার লজ্জা দিয়ো না!”
পা দুটো নেমে চপ্পলে ঢুকে গেল যথাসমেত। শেষ বিদায়ের যাত্রী, তার যাত্রা শুরু করতে চলেছে!
মনে মনে আওড়ালেন তিনি, “এই মৃত্যুর কেবল হবে অবসর, শুধুই আমার মৃত্যুতে!”
সমাপ্ত…
