গল্পঃ মানুষখেকো পেতাত্মা
লেখকঃ তুর্জয় শাকিল
মধ্যরাত ।
চাঁদটা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে । নদীর পানিতে ঢেউয়ে চাঁদের অবয়ব ইচ্ছেমত নাচছে । নুরু নদীতে জাল ফেলে চুপচাপ বসে আছে । নৌকা ভাসছে নিজের ইচ্ছে মত । একটুপর জাল টানা শুরু করলো নুরু । মাছগুলো জাল থেকে ছাড়িয়ে পাত্রে রাখছে ও। মাছ ধরতে ধরতে ওর নৌকা একটা চরে এসে আটকায় । অনেক পরিশ্রম হয়েছে এতক্ষন ওর ।
নৌকার গুলইয়ে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল ও । তারপর নৌকা থেকে চরে নামলো । আগে কখনও আসে নি ও এই চরে ।
পুরো চরটা ছোট ঝোঁপঝাড় আর ফসলের ক্ষেতে ভরা । শুধু দূরে চরের মাঝখানে ছোট একটা ঘর দেখা যাচ্ছে যেখানে আলো জ্বলছে । নুরু হাঁটতে হাঁটতে ঘরের দিকে যেতে লাগলো । হঠাৎ ও দেখলো একটু দূরে একটা গরু ক্ষেতে ঘাস খাচ্ছে । অবাক হল খুব । এই জনমানবহীন চরে এতরাতে গরু কোথা থেকে আসলো ? একটু সামনে এগিয়ে ও দেখলো গরুটাকে আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না । হঠাৎই উধাও হয়ে গেছে যেন । থমকে দাঁড়ালো নুরু ।
তখনই ও দেখলো ওর সামনে সাদা কাপড় পড়া কিছু লোক হাঁটছে । নুরুর মাথা যেন ঘুরছে । এতক্ষণ তো কাউকে দেখে নি ও । তাহলে এই লোকগুলো হঠাৎ কোথা থেকে আসলো!!
লোকগুলো নুরুর দিকে ফিরে তাকালো । সবাই খুব বিষন্ন আর সবার মুখেই অসংখ্য ক্ষত যেখান থেকে অবিরত রক্ত ঝরছে ।
নুরু ভয়ে ঘরের দিকে দৌঁড় দিল ; ও ভাবলো ঘরে হয়তো মানুষ আছে ।ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘরের দিকে ছুটতে থাকলো । ওর কাছে মনে হল পিছন থেকে কে যেন বার বার ওকে বাধা দিচ্ছে । কিন্তু ও কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘরের দিকে যেতে লাগলো ।
ঘরের সামনে গিয়ে দরজার ফুটো দিয়ে উঁকি দিল ও । তখন যা দেখলো তাতে ওর রক্ত হিম হয়ে গেল । একটা লাশ ঝুলছে ঘরের ভিতর আর দুইজন লোক ছুরি দিয়ে কেটে কেটে মৃত লাশটার মাংস খুবলে খুবলে খাচ্ছে । ভয়ে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল ওর । আবার উল্টোদিকে দৌঁড়াতে শুরু করলো নুরু ।
আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না । দৌঁড়ে সোজা ও নৌকার কাছে চলে আসলো । কোন রকমে ঢেলে নৌকাটাকে পানিতে নামিয়ে জোরে জোরে দাঁড় বাইতে লাগলো । নদীর মাঝখানে এসে কিছুটা শান্ত হল ও । তবে বুক এখনও কাঁপছে ওর ।
হাত ব্যথা হয়ে গেছে দাঁড় বাইতে বাইতে ; তারপরও থামছে না ও । কিছুক্ষণপর তীর দেখতে পেল । খুশিমনে এবার ধীরে ধীরে দাঁড় বাইতে লাগলো ও । তীরের কাছাকাছি আসতেই ও লাফ দিয়ে নৌকা থেকে নামলো । তীরে এসে চোখ বন্ধ করে বালিতে শুয়ে পড়লো ও । একটুপর চোখ খুললো । চোখ খুলেই দেখলো সেই ঝুলন্ত লাশটা ওর পাশে পড়ে আছে । চোখগুলো খোলা ; জিহ্বা বাইরে বের হয়ে আছে । ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো ও । চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলো ঘুরে ফিরে ও আবার আগের চরেই চলে আসছে ।
দৌঁড়ে ও নৌকায় গেল । নৌকায় উল্টোদিকে ফিরে দুইজন লোক বসে আছে । নুরু নৌকায় উঠতেই লোকগুলো ওর দিকে ফিরে তাকালো । লোকগুলোর মুখে একটুও চামড়া বা মাংস নেই ; শুধু কোটরে চোখ দুটো রক্তের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে ; দাঁতগুলো বেয়ে রক্ত ঝরছে । চারপাশের বাতাসে তাজা মানুষের রক্ত আর মাংসের গন্ধ ভসে বেড়াচ্ছে ।
আর সহ্য হল না নুরুর । জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো ও ।
কিছুক্ষণপর জ্ঞান ফিরলো ওর । চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলো ও নৌকার গুলইয়ে শুয়ে আছে । আর একজন লোক ওর পাশে বসে আছে । সকাল হতে শুরু করেছে সবেমাত্র । অন্ধকার কাটছে ধীরে ধীরে ।নুরু উঠে বসলো ।

– আন্নে কে?
– আমি কালু মাঝি । তুমি কেডা? এইহানে কী কর ?
নরু তখন এতক্ষণ ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাগুলো সব বলল ।
সবশুনে কালু মাঝি বলল,
– এই চর তো খুব ভয়ানক । দুইডা পিচাশ প্রেতাত্মা থাহে এইহানে । অরা মাইনষের গোশত খায় । তোমার কপাল তো ভালা মিয়া, বাইচ্যা গেছো । এই রাইত বিরাতে মাছ ধইরো না আর ।
নুরু ঘাড় দুলালো ।
– তোমার বাড়ি কই?
– কুসুমতলী গাঁ ।
– পাশের গাঁয়েই আমি থাহি । এই মাছ কয়ডা আমাগো বাড়িতে দিয়া আইবা ভাই? আমি কামে আরেক জায়গায় যামু । দিয়া আসলে খুউব উপকার হইতো, এই বলে কালু মাঝি নুরুকে এক থলি মাছ দিলো ।
নুরু মাছগুলো হাতে নিয়ে বলল,”আইচ্ছা দিয়া আমু নে।”
কালু মাঝি খুশি হল খুব । ও চলে গেল ।
নুরু নৌকা নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল ।
সকাল হয়ে গেছে তখন ।
সূর্য উঠেছে ।
নুরু কালু মাঝির বাড়িতে গেল । একজন বুড়ো মহিলা উঠানে বসে ছিল । নুরু মহিলাটকে জিজ্ঞাসা করলো,
– এইডা কি কালু মাঝির ঘর?
– হ, তুমি কেডা ?
– আমি নুরু । হেয় এই মাছ কয়ডা পাঠাইছে; হেয় কামে গেছে । পরে আইবো ।
নুরুর কথা শুনে অবাক হল বুড়ো মহিলাটা ।
– কালু!! কালু পাঠাইছে এই মাছ !! কেমতে ? আমার পোলা তো মেলা দিন আগে মইরা গেছে । ওর লাশ নদীতে ভাইস্যা আইছে । ওর লাশের হুদা মুখটাই চিনছি আমরা । পুরা শরীলে গোশত আছিলো না । আমরা এহনও জানি না কালু মরছে কেমতে ।
বুড়ো মহিলার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই নুরু মাছগুলো রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো । ওর এখনও ঘোরের মাঝে আছে । বুড়ো মহিলার কথাগুলো ওর বুকে কাঁপুনি ধরিয়েছে আবার ।
ও রাতের ঘটনা গুলোকে মিলিয়ে বুঝতে পারলো কালু মাঝি কীভাবে মারা গেছে । হয়তো ওর মতই ভুলে ঐ চরে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ।আর তার আত্মাই গতরাতে ওর প্রাণ বাঁচিয়েছে ।
নুরু মনে মনে ধন্যবাদ দিল তাকে ।আর কালু মাঝির ঐ কথাটা ও হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে,”এই রাইত বিরাতে মাছ ধইরো না আর ।”
তুর্জয় শাকিলের বইগুলো সংগ্রহ করতে পারেন রকমারি থেকে



