গল্পঃ হাতিরঝিলের অতৃপ্ত আত্মা
লেখকঃ তুর্জয় শাকিল
রাত তখন আড়াইটা। যান্ত্রিক ঢাকা শহর কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। ফুডপান্ডার রাইডার রাজু তার বাইক নিয়ে হাতিরঝিলের মেইন রোড দিয়ে রামপুরার দিকে ফিরছিল। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো কুয়াশায় ঢাকা পড়ে একটা হলদেটে আভা তৈরি করেছে।
এফডিসির মোড় পার হওয়ার সময় রাজু দেখল ব্রিজের ওপর ছোটো একটা বাচ্চা একা দাঁড়িয়ে আছে। হাতিরঝিলের নির্জন রাস্তায় এই সময়ে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাজুর বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। সে বাইকের গতি বাড়াতে চাইল, কিন্তু ঠিক পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে হলো ছেলেটি কাঁদছে। মায়ায় পড়ে রাজু বাইক থামাল।
“এই ছেলে, এই রাতে এখানে কী করছো? কোনো বিপদ হয়েছে তোমার?” রাজু জিজ্ঞেস করল।
ছেদেটি মুখ না তুলেই নিচু স্বরে বলল, “ভাই, আমাকে কি বাড্ডা মোড়ে একটু নামিয়ে দেবেন? আমার মা খুব অসুস্থ।”
ছেলেটি বাইকের পেছনে বসতেই রাজু অনুভব করল তার পিঠের দিকটা হঠাৎ বরফ শীতল হয়ে গেছে। অথচ বাইরের আবহাওয়া ছিল বেশ গুমোট।
রাজু জিজ্ঞাসা করলো, তোমার নাম কী?
আমার নাম সাব্বির।
তুমি এত রাতে এখানে কেন একা দাঁড়িয়ে কান্না করছো?
আমি এখানে কাজ করি। ফুফু হঠাৎ রাতে বলল মা নাকি অসুস্থ। তাকে হাসপাতাল নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত রাতে কোথাও বাস, রিকশা কিছু ই পাই নি। তাই কী করবো বুঝতে না পেরে কান্না করছিলাম।
রাজু আর কিছু না বলে বাইক চালাতে লাগলো।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ বাইকের লুকিং গ্লাসে নজর পড়তেই রাজু সেখানে নিজের চেহারা দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু পেছনে বসা ছেলেটির কোনো প্রতিবিম্ব সেখানে নেই! রাজুর গলা শুকিয়ে এল, কিন্তু সাহস করে বাইক চালাতে থাকল।
মধুবাগ ব্রিজের মাঝামাঝি আসতেই খেয়াল করল হাতিরঝিলের কালো পানির ওপর দিয়ে কেউ একজন হেঁটে আসছে। না, কোনো নৌকা নয়, কোনো মানুষই পানির ওপর পা ফেলে ধীরগতিতে তাদের বাইকের সমান্তরালে এগিয়ে আসছে। রাজু আঁতকে উঠে পেছনে তাকিয়ে দেখল পেছনে কেউ নেই! সিটটা খালি। কিন্তু বাইকের ওজন কমেনি, বরং মনে হচ্ছে পেছনের চাকাটা ভারে বসে যাচ্ছে।
হঠাৎ রাজুর কানের একদম কাছে সেই ছেলের কণ্ঠটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে যেন বাতাসের সবটুকু অক্সিজেন শুষে নিল কেউ।
“রাজু… আমার মা তো ঝিলের ওই কালো পানির নিচে থাকে। তুমি কি আমাকে ওখানে নিয়ে যাবে?”
রাজু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বাইকের ব্রেক কষতেই চাকা স্লিপ করে সে পড়ে গেল।রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে আবছা চোখে অন্ধকার ঝিলের পানির দিকে তাকাতেই সে দেখল, পানির ভেতর থেকে অনেকগুলো সাদা ফ্যাকাশে হাত আকাশের দিকে উঠে আসছে। সবাই যেন তাকে ডাকছে।
পুলিশ রাজুকে ব্রিজের ওপর থেকে উদ্ধার করে। তার শরীরে কোনো জখম ছিল না, কিন্তু সে জ্বরে কাঁপছিল। তার বাইকের সিটের ওপর পাওয়া গিয়েছিল একমুঠো ভিজে কাদা আর শাপলা ফুল যা হাতিরঝিলের গভীর অংশ ছাড়া পাওয়া অসম্ভব।
রাজু সুস্থ হওয়ার পর তার বাইকের হেলমেট খুলতেই দেখল, হেলমেটের ভেতরে নখ দিয়ে কেউ খোদাই করে লিখে রেখেছে— “পরের বার আমি আসব না, তুমি আসবে।”
রাজু সেই ঘটনার পর সাত দিন ঘর থেকে বের হতে পারেনি। কিন্তু বিভীষিকা তাকে মুক্তি দেয়নি। বরং হাতিরঝিলের সেই সাব্বির এখন তার শোবার ঘরে হানা দিতে শুরু করেছে।
ঘটনার দশ দিন পর। রাজু সবেমাত্র সুস্থ হয়ে আবার কাজে জয়েন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত ১১টা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে যখন মুখ ধুতে গেল, কল ছাড়তেই তার হাত যেন জমে পাথর হয়ে গেল। কল দিয়ে সাধারণ জল বের হচ্ছে না; বের হচ্ছে ঘন, কালো এবং কুৎসিত পচা গন্ধের নর্দমার জল। সেই জলের সাথে বেসিনে এসে পড়ল একটি জ্যান্ত শাপলা ফুলের কলি, যা মুহূর্তেই পচে কালো হয়ে গেল।
রাজু দৌড়ে সেখান থেকে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নার কাঁচটা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আছে, যেন ঘরের ভেতর কেউ খুব জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। কুয়াশার ওপর আঙুল দিয়ে কেউ লিখছে— “পানি খুব ঠান্ডা, রাজু আমাদের একা লাগছে। আমরা তো এই হাতিরঝিলের তলে মরে পড়ে আছি। কত লাশ যে এখানে আছে। কেউ নিজেই নিজেই আত্মহত্যা করেছে। কাউকে আবার খুন করে লাশ এখানে ফেলে দিছে, কাউকে আবার তার প্রিয়জন বিশ্বাসঘাতকতা করে মেরে ফেলে দিয়েছে। এই হাতিরঝিলের পানি যে কতশত মৃত্যুর সাক্ষী! “
রাজু এসব দেখে ভয়ে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার পায়ের তলার মেঝেটা ভিজে উঠছে। তার ফ্ল্যাট চারতলায়, অথচ মেঝে দিয়ে জল উঠছে কীভাবে?
সে পাগলের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে দৌড় দিল। লিফটের দরজা খুলতেই সে দেখল ভেতরে সেই ছেলে সাব্বিরের লাশ পড়ে আছে। রাজু দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে চাইল, কিন্তু দেখল সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে ধাপে জমে আছে হাতিরঝিলের সেই ফ্যাকাশে কাদা।
লিফটের ভেতর থেকে সেই খিলখিল হাসি আবার ভেসে এল। রাজু সেদিকে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটির কোনো চোখ নেই; চোখের জায়গায় কেবল দুটো গর্ত, যেখান থেকে অনবরত হাতিরঝিলের কালো জল উপচে পড়ছে। সে তার বরফশীতল হাতটা বাড়িয়ে রাজুর কবজি খপ করে ধরলো।
রাজু অনুভব করল তার শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। ছেলেটি যখনফিসফিস করে বলল, “বাইকটা ঝিলের ওপারেই রাখা আছে, চলো এবার ফেরা যাক।”
ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো অ্যাপার্টমেন্টের বিদ্যুৎ চলে গেল।
পরদিন সকালে হাতিরঝিলের মধুবাগ ব্রিজের নিচে জেলেরা একটি বাইক খুঁজে পায়। বাইকের সাথে বাধা ছিলো রাফির লাশ। তার চোখ দুটো খোলা, যেন সে বিস্ময়ে কিছু দেখছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল ঝিলে কোনো শাপলা ফুল না থাকলেও তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল সেই নীল রঙের একটা শাপলা ফুল।
এরপর কেটে গেল কয়েক মাস।
কিন্তু রাজুর মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করা গেল না। তার মৃত্যু রহস্য অজানাই থেকে গেল।
শহরের কোলাহলে হাতিরঝিল আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
আজ সোমবার। রাত প্রায় তিনটা। তুহিন বাইক নিয়ে হাতিরঝিলের মেইন রোড দিয়ে রামপুরার দিকে ফিরছিল। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো কুয়াশায় ঢাকা পড়ে একটা হলদেটে আভা তৈরি করেছে।
এফডিসির মোড় পার হওয়ার সময় রাজু দেখল ব্রিজের ওপর ছোটো একটা ছেলে একা দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা ইশারায় তুহিনকে বাইক থামাতে বলল। তুহিন বাইক থামালো। কেমন একটা পৈশাচিক হাসি ফুটল ছেলেটার মুখে …
তুহিন তো জানে না এত রাতে এখানে বাইক থামানো নিষেধ… !
আর হ্যাঁ আপনাকেও বলছি গভীর রাতে কারো ইশারায় বাইক থামাবেন না। হয়তো আপনিও কাউকে সহযোগিতা করতে গিয়ে কোনো অতৃপ্ত আত্মার শিকারে পরিণত হবেন … ..
